mit

জুলাই ১৫, ২০২০

একাত্তরে ভারতীয় সাহায্যের অনিবার্যতা ও স্বরূপ-অন্বেষা

একাত্তরে ভারতীয় সাহায্যের অনিবার্যতা ও স্বরূপ-অন্বেষা

আহমেদ মূসা : রাজনীতির নানা রঙে বিভক্ত বাংলাদেশের মানুষকে এখন মাঝে মাঝে এককাতারে নিয়ে আসে ক্রীড়াঙ্গন। ক্রিকেটের বিশ্ব-কাপ ময়দানে বাংলাদেশের সরব উত্থান এবং এ নিয়ে সাম্প্রতিক ঘটনা প্রবাহের ফলে বাংলাদেশের অন্তর্নিহিত মূলসুর ও শক্তিটি নতুন করে উদ্ভাসিত হয়েছে। এটি দীর্ঘ সময় ধরে সুপ্ত ছিল। প্রতিবাদ-নিন্দার মাধ্যমে বাংলাদেশের নির্বিশেষ মানুষ সরবে জানান দিয়েছেন, যে তারা না ভারতপন্থী, না পাকিস্তানপন্থী; তারা বাংলাদেশপন্থী। র’ বা আইএসআই নয়, বাংলাদেশের মানুষ বাংলাদেশেরই দালাল। অতি অল্পসংখ্যক ব্যতিক্রম আছে, কিন্তু ব্যতিক্রম ব্যতিক্রমই। আবার প্রতিবাদ করতে গিয়ে অনেক বাড়াবাড়ি হয়েছে। এগুলিও ব্যতিক্রমই।
বাংলাদেশের মানুষ যে বাংলাদেশ-অন্তপ্রাণ, বিষয়ীগতভাবে এটা জানান দেওয়ার প্রয়োজন ছিল। খেলার মাঠে ভারতীয় ও পাকিস্তানীরা মিলে বাংলাদেশকে প্রতারিত করেছে এবং লোটাস কামালকে ট্রফি বিতরণ ও মঞ্চে উঠতে না দিয়ে বাংলাদেশকে অবজ্ঞা করা হয়েছে। ‘মওকা’ নামক বিজ্ঞাপন বানিয়ে চরম অপমান করেছে বাংলাদেশকে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীসহ সব ধর্ম-বর্ণের মানুষ সরাসরি এর প্রতিবাদ করছেন। বাংলাদেশের প্রতি এই নিষ্ঠুর আচরণ বাংলাদেশকে জাগাতেই সাহায্য করেছে।
আজ আমাদের উপলব্ধিজাত কিছু স্বীকারোক্তির সময় এসেছে যে, কিছু অপ্রত্যাশিত ও গোলমেলে প্রচার আমাদের সব সময়ই বিভ্রান্ত করেছে। আমাদের পবিত্র ধর্ম ও মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে কখনো কোনো বিরোধ ছিল না। কিন্তু কিছুলোক সব সময়ই এ দুই প্রত্যয়ের মধ্যে বিরোধ-বেড়াজাল সৃষ্টির চেষ্টা করে আসছেন রাজতৈক ফায়দা হাসিলের জন্য। আর ‘ইসলাম খতরে মে হ্যায়’ বলে পাকিস্তান ও তাদের এদেশীয় কিছু দালাল নির্বিচারে গণহত্যা ও ধর্ষণসহ ভয়াবহ অনৈসলামিক কাজ ও ব্যাভিচার করেছে। ইসলামের মেকি-বরকন্দাজ পাকিস্তানই বরং ব্যর্থ রাষ্ট্রের দিকে ধাবিত হচ্ছে, যদিও হুশ হচ্ছে না অনেকের।
কিছু লোক আবার ভারত ও আওয়ামী লীগের উগ্র বিরোধিতা করতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধেও কথাবার্তা বলে ফেলেন। এটাকে আরো উষ্কে দেন তারা, স্বাধীন বাংলাদেশকে যারা আন্তরিকভাবে গ্রহণ করতে পারেননি।
আবার কিছু লোক ‘ভারতের সবই মহান’ বলে চালিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টাও করে আসছেন। ভারতের বাংলাদেশ-বিরোধী পদক্ষেপ বা ভারতীয় কিছু লোকের আপত্তিকর কথাবার্তা তাদের বিচলিত করে না।। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ভারতের কোনো কোনো মহলের ধৃষ্টতাপূর্ণ মন্তব্যও তাদের গায়ে লাগে না বা তারা তার প্রতিবাদ করেন না।
ভারত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা করেছে সন্দেহ নেই। তাই বলে বাংলাদেশের চামড়া খুলে নিয়ে তারা ডুগডুগি বাজাবে তাতো হতে পারে না। ভারতের আচরণের কারণেই আজ আমাদেরকে অপ্রিয় সত্যিকথাটি জোরের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, ভারতের সাহায্য-সহায়তা নিঃস্বার্থ ছিল না। একাত্তরে আমরা আমাদের দেশের স্বাধীনতা চেয়েছি, আর ভারত তার চির-বৈরী পাকিস্তানকে ভাঙতে চেয়েছে। একাত্তরে আমাদের ও ভারতের স্বার্থ একটি বিন্দুতে এসে মিলিত হয়েছিল। আমরা স্বার্থ উদ্ধারে ভারতকে সাহায্য করেছি আর ভারত আমাদের সাহয্য করেছে পাকিস্তান ভাঙার লক্ষ্য নিয়ে। স্বাধীনতার লক্ষ্য অর্জনে আমরা হারিয়েছি ৩০ লাখ শহীদ, দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম ও অগুনতি সম্পদ। আর, ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হিসেব মতে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে ১ হাজার ৯৮৪ জন ভারতীয় শহীদ হয়েছেন। এরমধ্যে রয়েছেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর ১ হাজার ৭৬৯ জন, নৌবাহিনীর ২০৪ জন এবং বিমানবাহিনীর ১১ জন শহীদ। দৈনিক প্রথম আলো : ২১ নভেম্বর ২০১৬)।
ভারতের আরেকটি অন্যতম লক্ষ্য ছিল যুদ্ধের নেতৃত্ব বামপন্থীদের হাতে চলে যাওয়া প্রতিরোধ করা। এ জন্য তারা তাজউদ্দিন আহমদ ও কর্নেল ওসমানীসহ যুদ্ধরত বাংলাদেশের সামরিক-বেসামরিক নেতাদের উপদেশ-অনীহা উপেক্ষা করে আলাদা একটি বাহিনীও সৃষ্টি করেছিল। তাই ভারতীয় সাহায্যের ক্ষেত্রে দান-উদারতার তেমন কোনো ব্যাপার নেই। ভারত তাদের স্বার্থের কথা গোপনও রাখেনি। ১৯৭১ সালের ৭ এপ্রিল ভারতের প্রতিরক্ষা গবেষণা কেন্দ্রের তৎকালীন পরিচালক কে সুভ্রাম্মনিয়াম স্পষ্ট করেই বলেছেন, ‘ভারকে উপলব্ধি করতে হবে যে আমাদের স্বার্থেই পাকিস্তানকে ভেঙ্গে দেওয়া উচিত এবং এবারে আমরা যে সুযোগ পেয়েছি সে ধরনের সুযোগ আসার আসু আর কোনো সম্ভাবনা নেই।’ (‘১৯৭১, পরাজয় ও আত্মসমর্পণের পাকিস্তানী মূল্যায়ন : জগলুল আলম, পৃষ্ঠা – ৬৩)।
মুক্তিরুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার এবং ১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্সে পাকিস্তানীদের আত্মসমর্পন অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পক্ষে প্রতিনিধিত্বকারী এ কে খন্দকার লিখেছেন, ‘আমরা যারা সামরিক বাহিনীর লোক ভারতে গিয়েছিলাম, তারা ভারতীয় বাহিনীকে পাকিস্তানিদের সম্পর্কে যতটা সামরিক তথ্য দিয়েছি, ভারত তা পঞ্চাশ বছরেও জানতে পারত না। (১৯৭১ : ভেতরে বাইরে : পৃষ্ঠা -৮৩)।
১৯৭১ সালের ১২ এপ্রিল সিআইএ’র করা সমীক্ষার একাংশে বলা হয়, ‘২৫ মার্চ রাতে আকস্মিক হামলা চালানোর সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বোধ হয় মনে করেছিল যে আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করে পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে নিয়ে আসা যাবে। কিন্তু তাদের ধারণা ভুল প্রতিপন্ন হয়েছে। ১৩ হাজার ইপিআর ও সেনাবাহিনীর সদস্য নামমাত্র রসদ হাতে নিয়েই সারাদেশে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।’ ভারতের ভূমিকা সম্পর্কে সিআইএর আগাম মূল্যায়নে বলা হয়, ‘বাঙালিদের সাহায্য করার পেছনে ভারতের অবশ্য আরেকটি বড় কারণ রয়েছে। পাকিস্তানিদের সঙ্গে লড়াই দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে বিপ্লবের নেতৃত্ব বামপন্থিদের হাতে চলে যেতে পারে। এ ধরনের ঘটনায় ভারত বিশেষ করে পশ্চিম বাংলা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’ (মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের গোপন দলিল : জগলুল আলম : অবসর প্রকাশনী, পৃষ্ঠা – ১২৮Ñ১২৯)।
পরবর্তীকালে জননেতা আবদুল মান্নান ভুঁইয়া বলেছেন একই কথা। ‘আমার ধারণা, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ যদি আরও প্রলম্বিত হতো, ভারতীয় বাহিনী যদি যুদ্ধে জড়িয়ে অকস্মাৎ যুদ্ধের ছেদ না টানত তা হলে এদেশের ইতিহাস হতো ভিন্ন। যুদ্ধের পর সুবিধাবাদ, স্বজনপ্রীতি, স্বৈরচিন্তা, দুর্নীতি-লুণ্ঠন ও আত্মকেন্দ্রিকতার যে চিত্র আমরা দেখেছি, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে ঘটত না। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের মধ্য দিয়েই মানুষের চেতনা আরও শাণিত হতো, আরও বলীয়ান হতো। যুদ্ধ চলাকালেই ঝরে যেত সুবিধাবাদী পরগাছারা, দুর্নীতবাজ ও লুটেরারা। সামনে চলে আসত দেশপ্রেমিক নির্লোভ নেতৃবৃন্দ। ক্ষমতা চলে যেত যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী কৃষক-শ্রমিক মেহনতি মানুষ ও তাদের প্রতিনিধিদের হাতে। সম্ভবত এই ভয়েই যুদ্ধে অনভিজ্ঞ ও অনিচ্ছুক তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব যুদ্ধের দ্রুত সমাপ্তি টানতে চেয়েছেন। তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্বকে এমন একটা যুদ্ধ পরিচালনা করতে হয়েছে যে-যুদ্ধ তারা আহ্বান করেননি। (বাংলাদেশের রাজনীতি ও সুশাসন ভাবনা, পৃষ্ঠা- ২৩)।
তবে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সশস্ত্রপর্ব একান্তভাবে ভারতীয় ছক অনুযায়ী পরিচালিত হলেও যুদ্ধটিকে জনযুদ্ধ তথা প্রতিটি দেশপ্রেমিককে অংশগ্রহণের ন্যায্যতায় বিশ্বাসী সেক্টর কমান্ডারগণসহ সামরিক-বেসামরিক নেতৃত্বের পুরোধা অংশের সদিচ্ছায় অসংখ্য বামপন্থী এই যুদ্ধে অংশ নেন। কেউ কেউ যুদ্ধ করেন দেশের ভেতরে থেকেই। অনেক সেক্টর-উপসেক্টর কমান্ডার অনেক ঝুঁকি নিয়েও আওয়ামী লীগ বহির্ভুতদের যুদ্ধে অংশগ্রহণের সুযোগ কওে দেন।
‘খালেদ মোশাররফ ও হায়দারের নেতৃত্বাধীন সেক্টর ২-কে চিহ্নিত করা হলো বাম বা লাল সেক্টররূপে। বিএলএফ যাঁর তত্ত্বাবধানে গড়ে উঠেছিল, তিনি মেজর জেনারেল উবান। সম্ভবত ছাত্র ও যুবনেতাদের অভিযোগের ভিত্তিতে মেজর জেনারেল উবান জুলাইয়ের দিকে ভারত সরকারের উচ্চপর্যায়ে অভিযোগ করেন যে খালেদ মোশাররফ, মঞ্জুরসহ কয়েকজন সামরিক অফিসারের প্রশ্রয়ে মুক্তিবাহিনীতে বামদের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। (জহিরুল ইসলাম : মুক্তিযুদ্ধে মেজর হায়দার ও তাঁর বিয়োগান্তক বিদায় : পৃষ্ঠা- ১৭৮)।
‘যুদ্ধ মূলত ভারত থেকে পরিচালিত হওয়ায় এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব আওয়ামী লীগের কব্জায় থাকায় যুদ্ধে অংশগ্রহণ বামপন্থীদের জন্য নানা কারণেই ছিল কঠিন। মুক্তিযুদ্ধে একদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের সরাসরি সাহায্য-সমর্থন এবং অন্যদিকে চীনের বিরোধিতা চীনপন্থীদের জন্য ছিল নাজুক অবস্থা। নির্বিশেষ-বামপন্থীদের প্রতিই ছিল আওয়ামী লীগের অবিশ্বাস ও অনাস্থা। এরপরও প্রকাশ্য দলগুলির মধ্যে সিপিবি, মোজাফফর ন্যাপ, ভাসানী ন্যাপ প্রভৃতি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে, যদিও আগস্ট মাসে ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তির পূর্ব-পর্যন্ত সিপিবি, মোজাফফর ন্যাপ ও তাদের অঙ্গ সংগঠনের লোকেরা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধের জন্য অস্ত্র পায়নি। ভাসানী ন্যাপ ও সমজাতীয়দের যুদ্ধ করতে হয়েছে এমনকি আত্মপরিচয় গোপন রেখে। অন্যদিকে চীনপন্থী গোপন দলগুলির অতিক্ষুদ্র অংশ যুদ্ধকে গণ্য করেছে ‘দুই কুকুরের লড়াই’ বলে।’ (আমার সম্পাদিত গ্রন্থ ‘জনগণের মুক্তিযুদ্ধ চেতনার স্বরূপ সন্ধান’ : দিব্যপ্রকাশ, পৃষ্ঠাÑ৮১)।

২০১৮ সালের ২৮ জুন গণফোরাম আয়োজিত ইফতার-পূর্ব মতবিনিময় সভায় ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘যদি কেউ বলে ইন্ডিয়া আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছে তবে সেটি ভুল। ইন্ডিয়া বা কারো দয়ায় আমরা স্বাধীনতা পাইনি। ইন্ডিয়া আমাদেরকে উসকে দিয়েছে, এটা ডাহা মিথ্যা কথা। ইন্ডিয়া আমাদেরকে স্বাধীনতা এনে দেয়নি। দেশের জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। তবে ইন্ডিয়া আমাদের সাহায্য করেছে। লাখ প্রাণের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছি।’ (বাংলামেইল২৪ডটকম)।
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) আয়োজিত সমাবেশে জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের কাছে আমাদের যে ঋণ ছিল তা আমরা আগেই শোধ করেছি। এখন যেটা টানছি সেটা সুদ। ভারত সমৃদ্ধশালী দেশ হওয়ার পরও আমাদের ওপর থেকে সুদ আদায় করে নিচ্ছে, যেভাবে পূর্ব পাকিস্তানের ওপর থেকে পশ্চিম পাকিস্তান জোরজুলুম করে আদায় করেছিল।.. একটি দেশের সঙ্গে ট্রানজিট হতে পারে। এ জন্য সে দেশের রাস্তা ঘাটের যে ক্ষতি হবে তার ক্ষতি পূরণের বিনিময়েই এটা সম্ভব। কিন্তু বর্তমান সরকার ভারতকে যে ট্রানজিট দিয়েছে তা নামমাত্র ক্ষতিপূরণে। ..বর্তমান সরকার অগণতান্ত্রিক ও অনির্বাচিত সরকার, আর এই অনির্বাচিত সরকারকে ভারতই টিকিয়ে রেখেছে তাদের নিজেদের স্বার্থে।’ (বাংলাদেশ প্রতিদিন : ১৭ জুন ২০১৬)।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ায় ভারতীয় লাভালাভ সম্পেের্ক যুক্তরাষ্ট্রের অস্টিন কমিউনিটি কলেজের অধ্যাপক ড. মতিউর রহমান লিখেছেন : বাংলাদেশের সাথে ভারতের প্রায় ৪,৫০০ কিলোমিটারের স্থল-সীমান্ত রাতারাতি শত্রুমুক্ত হয়ে গেলো। বঙ্গোপসাগর এলাকা তাদের জন্য শত্রুমুক্ত হলো। এটা যে কতবড় একটা স্বস্তি তা একমাত্র সদা শত্রু-বেষ্টিত রাষ্ট্র (যেমন, ইসরাইল/প্যালেস্টাইন, ইউক্রেইন/রাশিয়া, ইত্যাদি) হাড়ে হাড়ে টের পায়। ফলে, ভারতের এই বর্ডার রক্ষার জন্য তাদের সামরিক খরচ আগের চেয়ে বছরে হাজার হাজার কোটি রূপি কমে গেলো যা, তারা এখন ব্যয় করতে পারছে চীনের সাথে তাদের অন্য সীমান্তকে সুদৃঢ় করার জন্য, কিংবা তাদের রাষ্ট্রের উন্নয়নমূলক কাজের জন্য। ২. ভারত বাংলাদেশের ১৬ কোটি লোকের একটা বিশাল বাজার পেয়ে গেলো অনায়াসে। এতে ভারত বছরে লাখ লাখ কোটি রূপির মুনাফা পেয়ে যাচ্ছে, চাঙ্গা হচ্ছে তার অর্থনীতি। বাংলাদেশ এখন ভারতে বৈদেশিক মূদ্রা প্রেরণকারী একটি শীর্ষ দেশ। ৩. বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ট্রানজিট সুবিধা আদায় করে ভারত দ্রুত ও সহজ যোগাযোগের মাধ্যমে তার সশস্ত্র সংগ্রামরত পূর্বাঞ্চলীয় ‘সেভেন সিস্টার’ রাজ্যগুলোকে ভালভাবেই ম্যানেজ করতে পারবে।.. আমাদেরকে স্বাধীনতাযুদ্ধে সহায়তা দিয়েছে, তাই আমরাও ভারতের প্রতি কৃতজ্ঞ। কিন্তু এই কৃতজ্ঞতাবোধ থাকা উচিত উভয় পক্ষ থেকেই, কেবল বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতের প্রতি নয়। উভয়েরই এতে চিরস্থায়ী লাভ হয়েছে। তাই একশ্রেণীর ভারত-প্রেমী বাংলাদেশীদেরকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, আত্মমর্যাদা নিয়ে চিন্তা করতে শিখুন, নিজ রাষ্ট্রকে হেয় করবেন না, স্বীকার করুন, ভারতকেও চির-ঋণী থাকা উচিত বাংলাদেশের কাছে।’ (ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে সংগ্রহীত)।
মুক্তি ও মিত্র বাহিনীর যৌথ যুদ্ধে পরাজিত পাকিস্তানীদের অস্ত্র ও অন্যান্য যুদ্ধ-সম্ভার ভারত নিয়ে গিয়েও কম লাভবান হয়নি। ‘আমরা যখন নরসিংদী মুক্ত করি, ভারতীয় বাহিনী তখন নরসিংদী থেকে অনেক দূরে। মাত্র ভৈরব পর্যন্ত পৌঁছেছে। টি.অ্যান্ড.টি. ক্যাম্প দখল করে সেখানে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করি। ক্যাম্প দখলের পর ভেতরে ঢুকে অস্ত্রের সম্ভার দেখে আমরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাই। ঘরবোঝাই হালকা ও ভারী মেশিনগান। থরে থরে সাজানো রকেট লঞ্চার আর দুই ইঞ্চি মর্টার। অফুরন্ত গোলাগুলি আর গ্রেনেড। এত অস্ত্র আজ আমাদের হস্তগত। অথচ পুরো যুদ্ধের সময় অস্ত্রের কত অভাবই না আমরা বোধ করেছি। ভারতীয় সেনাবাহিনীর অফিসার ও কয়েকজন ভারতীয় সৈনিক, তাঁরা আমাদের নরসিংদী মুক্ত করার জন্য ধন্যবাদ জানালেন এবং ঐ ক্যাম্পের দায়িত্ব তাঁদের হাত ছেড়ে দিতে বললেন। আমরা দখল করা অস্ত্রসম্ভার ভারতীয় বাহিনীর হাতে তুলে দিয়ে মনটা খারাপ করেই শিবপুর ফিরে এলাম।’ (হায়দার আনোয়ার খান জুনো; একাত্তরের রণাঙ্গন: শিবপুর।)
‘যুদ্ধেও প্রথম দিকে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি ভারতীয় সমর নায়কদের নিষ্ঠুর সিদ্ধান্তের প্রবল সমালোচনাও হয় পরবর্তীকালে। ‘দেশের ভেতরে প্রথম দিকে যে গেরিলাদলগুলো পাঠানো হয়েছিল, তার ফলাফল খুব খারাপ হয়েছিল। কয়েকটি গ্রেনেড আর একটি পিস্তল দিয়ে প্রকৃত গেরিলাযুদ্ধের ধারেকাছে যাওয়াও সম্ভব হয়নি। সে জন্য জুন-জুলাই পর্যন্ত যারা দেশের অভ্যন্তরে গিয়েছিল, তাদের অনেকেই আর ফিরে আসেনি। গেরিলাদলের কয়েকজন নিহত হলে বাকিরা পুনরায় যুদ্ধে যেতে সাহস হারিয়ে ফেলত।’ (এ কে খন্দকার, ১৯৭১ : ভেতরে বাইরে, পৃষ্ঠা ১০৩)।
যুদ্ধে বহুবার ভারতীয় বাহিনীকে বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে রক্ষার অনেক নজিরও রয়েছে মুক্তিবাহিনীর। ‘১৯৭১ সনজিরও রয়েছে মুক্তিবাহিনীর। ‘১৯৭১ সালে তো আমরা সরাসরিই জিতেছি, ভারত ছিল সহায়ক বাহিনী। এই যুদ্ধে আমাদের বাহিনী কয়েকটি যুদ্ধে ভারতকেও উদ্ধার করেছে বিপদ থেকে, সেকেন্ড বেঙ্গল না থাকলে ভারতীয় ১৮ রাজপুত মুকুন্দপুর থেকে ফিরতে পারত না।..আমরা সাহায্য না করলে ভারতীয় এম্ফিবিয়াস ট্যাংক মেঘনায় তলিয়ে যেত। হিলি, সোনামসজিদ, চৌগাছাসহ আরও অনেক জায়গায় মুক্তিবাহিনী যেভাবে পাকিস্তানিদের চেপে ধরেছিল, তার উদাহরণ তো যুদ্ধবিদ্যার ইতিহাসে খুব বেশি নেই। আমাদের রাজনীতিবিদ, আমাদের বুদ্ধিজীবীরা যদি এসব দেখতে পেতেন তাহলে সেনাবাহিনী নিয়ে দু’কথা বলার আগে চিন্তা ভাবনা করতেন। সেনাবাহিনীকে অকাজে ব্যবহার না করে যথাকাজে ব্যবহার করার জন্যে পেশাদারি মনোভাব নিয়ে গড়ে উঠবার সুযোগ দিতেন। (সাইদুল ইসলাম : আমাদের সামরিক শক্তি : ২৯ এপ্রিল ২০১৮ সালের ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে)।
আমাদের স্বাধীনতার যুদ্ধের সময় শরণার্থীদের রক্ষণাবেক্ষণসহ বিভিন্ন উদ্দেশ্যে বিভিন্ন রাষ্ট্র ১৯৭১ সালে বাংলাদেশকে সাহায্য করে। প্রবাসী বাঙালিরা সাহায্য করে সরাসরি বাংলাদেশ সরকারকে। কিন্তু রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ যেহেতু তখনো স্বীকৃতি পায়নি সেজন্য অন্যান্য রাষ্ট্রগুলো ভারত সরকারের কাছে সাহায্য পাঠায় জাতিসংঘের মাধ্যমে। মুক্তিযুদ্ধকালীন সাবসেক্টর অধিনায়ক, সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধ গবেষক এ এস এম সামছুল আরেফিন তার ‘মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তির অবস্থান’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ভারত সেই সময় বিভিন্ন রাষ্ট্র থেকে ১৬ কোটি ৮১ লক্ষ ৩ হাজার ৭ শ ২৭ ডলার সাহায্য পায়। (এ এস এম সামছুল আরেফিন : মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তির অবস্থান, সময় প্রকাশন, ২০১২, পৃ. ৪৫২)।
তা ছাড়া মুক্তিযুদ্ধে আমাদের বিজয়ের পর ভারত পাকিস্তানী অস্ত্র, যানবাহন প্রভৃতি নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি পাকিস্তানের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আকারে মোটা অংকের অর্থও আদায় করেছে। যেমন-
১. যুদ্ধের সময় ব্যবহৃত ও খোওয়া যাওয়া অস্ত্র, যন্ত্রপাতি, যানবাহন প্রভৃতির দাম বাবদ- ৫০,০০,০০,০০০ রুপি
২. যুদ্ধের সময় রেলপথে সৈন্য, মালামাল এবং অস্ত্রপাতির আনা নেয়া বাবদ- ৭,০৫,৩৬,৭২৬ রুপি
৩. ইন্ডিয়ান এয়ারফোর্সের ১৪ দিনের যুদ্ধবাবদ খরচ- ৫৫,৭১,০০,০০০ রুপি
৪. ১৯৭১ এর যুদ্ধে ইন্ডিয়ান নেভির খরচ- ৩৪,৯৮,৮২,৪৪০.৫৬ রুপি
৫. তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা শরণার্থীদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্যে ভারত সরকারের খরচ বাবদ সাকুল্যে- ৩২৬,০০,০০,০০০ রুপি
৬. যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্যে সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলিতে শস্যের ক্ষতি বাবদ- ৫২,৮৩,০০০ রুপি
৭. ইন্ডিয়ান নাগরিকদের সাহায্য ও পুণর্বাসন বাবদ খরচ- ১১৪১,০০,৭৫৫.৭৯ রুপি
৮. রাজ্য সরকার কর্তৃক জনগণকে দেয় ক্ষতিপূরণ- ২৫৮,৯২,৯২৫ রুপি
৯. সেনাবাহিনীর মৃত এবং আহতদের ক্ষতিপূরণ বাবদ- ১,৬১,৩৯,২৭৪ রুপি
১০. অফিসার, জেসিও, ও আর দের ক্ষতিপূরণ বাবদ- ১,৫৯,৭০,০০০-০০ রুপি
১১. বাংলাদেশ থেকে সৈন্য ফিরিয়ে আনা বাবদ- ৮৮,৭৯,৪৫৮’১৫ রুপি
১২. পিওএল বাবদ (চঙখ)- ৭,৫৩,০২,০০০-০০ রুপি
১৩. বেসামরিক গাড়ি ভাড়া/ রিকুইজিশন বাবদ- ৬,১০,২৯,৫২৫.৮৮ রুপি
১৪. যুদ্ধবন্দীদের রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ- ৩৮,০৯,৯৮,০০০ রুপি
সর্বমোট- ৫৪৩,৫১,১৪,২৯৪.৯০
(Source : Official 1971 War hisory, History Division, Ministry of Defence, Government of India, copy right BHARAT RAKSHAK, 1992, available at http://www.bharat-rakshak.com/archives/Official History/ 197War/ (last accessed 15/05/2016))

ভারতকে আরো স্মরণ করিয়ে দেওয়া উচিত, যে আগরতলা মামলা আকাশ থেকে পড়েনি। তাদের আজকের যে অগ্রগতি-প্রবৃদ্ধি তার পেছনে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের বিরাট ভূমিকা আছে। এগুলিও ভারতীয়দের হিসেবের মধ্যে রাখা উচিত। আমাদের অপমান করলেও কৃতজ্ঞতায় গদগদ থাকতে হবে এমন কোনো কথা নেই। ভারতকে আরো মনে রাখতে হবে যে, ¯œাযু যুদ্ধের কারণে সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশকে সমর্থন না দিলে ভারতের সাহায্য কোনো কাজে আসতো না। কিন্তু সোভিয়েত উইনিয়ন একবারও সেসব নিয়ে বাংলদেশকে খোটা দিতে যায়নি। এরাই যথার্থ ভদ্রলোক। পৃথিবীর প্রতিটি দেশের স্বাধীনতার যুদ্ধেই বাইরের কোনো বা একাধিক দেশ সাহায্য করেছে। এ নিয়ে ভারতের মতো কেউ হরহামেশা ঢোল পেটায় না। ভিয়েতনামের যুদ্ধে চীনের সাহায্য কিংবদন্তীতুল্য। কিন্তু র্মাদার প্রশ্নে সেই দুই দেশের মধ্যে একটা যুদ্ধও হয়ে গেছে। আমরা যুদ্ধ-বৈরিতা কোনোটাই চাই না। চাই সমমর্যাদা ও খেলার সময় প্লেন-লেভেল ফিল্ড। জোচ্চুরি নয়। বাংলাদেশ বন্ধুত্ব চায়, বন্ধুত্ব অক্ষুন্ন রাখতে চায়। ভারতকে ‘কলসীর কানা’ মারা বন্ধ করতে হবে।
আশার কথা, বাংলাদেশ তার নিজের দিকে তাকাতে শুরু করেছে। যারা পবিত্র ধর্ম ও মহান মুক্তিযুদ্ধকে ভোট যুদ্ধে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে সবসময় অস্ত্রে শান দিয়ে চলেছেন তাদের জন্যও দুঃসংবাদ আছে। এগুলি নির্বিচারে ব্যবহার করে আগের মতো ফল পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। যারা ভারত-বন্দনা বা ভারত-বিরোধিতাকে বাংলাদেশের রাজনীতির নিয়ামক করতে চান, সামনের সময়গুলি তাদের জন্য ভালো যাবে না।
ভদ্রতাবশত নির্মম সত্যগুলি আমরা আগে নির্দয় ভাবে বলিনি। এখন বলতে বাধ্য হচ্ছি। যারা মওকা বিজ্ঞাপন বানায় বা বাংলাদেশকে খাটো করে কথা বলে তাদেরও বলে দেওয়া দরকার যে, আমরা সাহায্য না করলে ভারত আজ এতো নিরাপদ ও নির্বিঘেœ থাকতে পারতো না। ইতিহাসে দেখি, ভারত যুগেযুগেই যুদ্ধে হেরেছে। একাত্তরে জিতেছে আমরা সঙ্গে ছিলাম বলে। উচিত কথার উচিত সময় এখন। ‘বিড়াল বেজার’ হলেও বলতে হবে।
বাংলাদেশের প্রতি ভারতের সাম্প্রতিক ব্যবহারকে কেন্দ্র করে আমাদের দেশের কেউ কেউ অশালীন মন্তব্যও করছেন। এটাও ঠিক নয়। মাথা গরম করে কথা বললেই কথা যুক্তিপূর্ণ হয় না। ভারতের কেউ অভদ্র ভাষা ব্যবহার করলে আমাদেরও তা করতে হবে এমন কোনো কথা নেই।
গত কয়েকদিন ধরে, বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যমগুলিতে কিছু ধর্মাশ্রয়ী গালিগালাজ এবং সে-সব নিয়ে আলোচনা চলছে। যেমন মালাউন, যবন, ম্লেচ্ছ ইত্যাদি। কাউকে এসব গালি দেওয়াও ঠিক নয়। কাউকেই মালাউন বলা উচিত নয়, কারণ মালাউন অর্থ অভিশপ্ত। কোনো মানুষই অভিশপ্ত নয়, অভিশপ্ত হতে পারে না। কারণ, মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। যবন বলে গালি দেয়া হতো ইউনানী গ্রীকদের। বলা হতো ইসলাম-পূর্ব আরব ব্যবসায়ীদেরও। প্রাচীন ভারতের পশ্চিম দিকের কিছু অংশ বহুকাল গ্রীকদের দখলে ছিল। গ্রীক মঞ্চনাটকের প্রভাব ছিল ভারতীয় মঞ্চনাটকে। যার জন্য নাটকের শেষে বলা হতো ‘যবনিকা পতন।’ ইউনান গ্রীসের প্রাচীন নাম। মুসলমানরা ভারতবর্ষে আসার বহু আগে থেকেই যবন শব্দটি প্রচলিত ছিল। মুসলমানদের গালি দেওয়া হতো ম্লেচ্ছ (কলুষিত) বলে। এগুলি প্রাচীন বা মধ্যযুগের গালি । একজন আধুনিক ও আলোকিত মানুষ এসব গালি দিতে পারে না।
পৃথিবীর প্রতিটি মানুষই তাদের ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-সম্প্রদায় নিয়ে গর্বিত। মাথা গরম কিছু লোক অন্যদের উপহাস করতে পারে, কিন্তু তারা মানব সভ্যতার মূলধারা নয়। আমরা আলোচনা করবো আলোকিত মানুষ নিয়ে, আলোকিত জীবনের প্রত্যাশা নিয়ে। এই তিনটি গালিই আমাদের পরিত্যাগ করা উচিত।
হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে এই গালিচর্চার পেছনে একটা ঐতিহাসিক ভ্রান্তিও রয়েছে। প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিকÑতিনকালেই ভারতবর্ষ সামগ্রিক ও আংশিকভাবে বহিরাক্রমণের শিকার হয়েছে, আক্রমণকারীদের হাতে পদানত হয়েছে। তখন অবশ্য প্রাচীন ভারতের প্রাকৃতিক ও রাষ্ট্র সীমা এখনকার চেয়ে ভিন্ন ছিল। তখন আফগানিস্তানের একটি অংশও ভারতের অংশ ছিল। প্রাচীনকালে ভারতে এসেছে আর্য, গ্রীক, শক-কুষাণ, আবীর, হুন, গুর্জর প্রভৃতি। তখন অবশ্য আমাদের বাংলাদেশসহ পূর্বভারতের অনেক অঞ্চলের পুরো সময়ের সব তথ্য জানা যায় না। খৃষ্ট-পূর্ব ১৮৫ থেকে ৩২০ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত পূর্ব ভারতের এই পাঁচ শতাধিক বছরের কোনো ইতিহাসই নেইÑগ্রীক পর্যটক ভার্জিল বা প্লিনির বর্ণনা ছাড়া।

মধ্যযুগে ভারতে এসেছে মুসলমানরা যাদের মধ্যে রয়েছে তুর্কী,পাঠান ও মোগল। আধুনিক যুগে এসেছে ইংরেজ, পর্তুগীজ, ফরাসী প্রভৃতি। ইংরেজরা প্রায় সারাভারতই দখল করেছিল। এরমধ্যে চন্দন নগরে ফরাসী ও গোয়ায় পর্তুগীজদের কুটি ছিল। রাজনৈতিক কারণ ছাড়াও শুধু মাত্র লুণ্ঠনের জন্য বার বার আক্রমণ হয়েছে ভারতে, বিশেষ করে দিল্লিতে। মধ্য এশিয়ার তৈমুর লঙ, ইরানের নাদির শাহসহ কত লুটেরার বিভীষিকা দেখেছে দিল্লী। খুশবন্ত সিং তার দিল্লি উপন্যাসে দিল্লির ধারাবাহিক পতনের বর্ণনা দিয়েছেন।
ভারতে বহু দেশ-জাতির মানুষ এসেছে, নতুন সভ্যতা নির্মাণ করেছে; রবীন্দ্রনাথ যাকে ‘এই ভারতের মহামানবের তীরে’ বলে প্রশংসা ও গর্ব করেছেন। প্রশংসা করেছেন পন্ডিত জওহর লাল নেহরুও। কিন্তু কিছু ভারতীয় ইতিহাসবিদ মুসলমানদের ওপরই শুধু ক্ষিপ্ত হয়ে লিখেছেন ও লিখে চলেছেন। মুসলমানদের পরে ইংরেজরা এসে প্রায় দুই শ বছর জন্য শাসন করে গেল। কিন্তু তাদের নিয়ে ইতিহাসগত খেদ কম। খেদটা মুসলমানদের প্রতিই বেশি। একই ধরনের খেদ তাদের বৌদ্ধদের প্রতিও। কারণ এই দুই ধর্মই দলে দলে গ্রহণ করেছেন বঞ্চিতরা। অনুদার অনেক ভারতীয় ইতিহাসবিদ খেদ তৈরি করেছেন অনেক। অবশ্য ভারতে রমিলা থাপার, হরবংশ মুখিয়া, ইরফান হবিব, ভগওয়ান এস গিদওয়ানি প্রমুখের মতো বস্তুনিষ্ট ও মানবতাবাদী ইতিহাসবিদও রয়েছেন।
আরেকটি ঐতিহাসিক কারণের কথাও বলা যায়। সনাতন-ধর্মী কারো কারো বর্ণবাদী আচরণের কারণেও ক্রিয়-প্রতিক্রিয়া হয়ে থাকে। সব ধর্মেই উগ্রগোষ্ঠী আছে।
পৃথিবীতে ধর্ম ও বর্ণবাদী গালির অভাব নেই। খৃষ্টানদের ফিরিঙ্গি, ইহুদিদের ডার্টি জু. কালোদের নিগার ইত্যাদি বলে উপহাস করা হয়। তবে আমাদের দেশে এসব উৎপাত কম। বাংলাদেশকে একটি উদার, আধুনিক ও গণতান্ত্রিক দেশ হিসাবে গড়ে তুলতে আজকের নির্বিশেষ-মানুষের মনো-পরিস্থিতি সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে, যদি সঠিক রাজনৈতিক নেতৃত্ব পায়। এখন সেটারই শুধু অভাব।

লেখা : নিউইয়র্ক : ৩১ মার্চ ২০১৫।
প্রকাশ : অনলাইন দৈনিক আমাদের সময়/সাপ্তাহিক বর্ণমালা প্রভৃতিতে ‘উচিত কথার উচিত সময়’ নামে প্রকাশের পর গ্রন্থে অন্তর্ভুক্তির আগে কিছু তথ্য সংযোজন করা হয়েছে।


সর্বশেষ সংবাদ

জবিতে ভর্তির মেধাতালিকা প্রকাশ

জবিতে ভর্তির মেধাতালিকা প্রকাশ

নিউজ ডেস্কঃ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২০-২০২১ শিক্ষাবর্ষে স্নাতক ১ম বর্ষে শিক্ষার্থীদের ভর্তির মেধাতালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার (৭ ডিসেম্বর) বিকাল

গরু দুধ না দেওয়ায় থানায় অভিযোগ কৃষকের

গরু দুধ না দেওয়ায় থানায় অভিযোগ কৃষকের

নিউজ  ডেস্কঃ নানা অভিযোগ নিয়ে থানায় যান মানুষ। কিন্তু গরু দুধ না দেওয়ায় অভিযোগে থানায় উপস্থিত হওয়ার খবর শুনে অনেকেই

ক্যাটরিনার বিয়েতে যাচ্ছে সালমানের গোটা পরিবার

ক্যাটরিনার বিয়েতে যাচ্ছে সালমানের গোটা পরিবার

বিনোদন ডেস্কঃ ক্যাটরিনা কাইফ ও ভিকি কৌশলের ভক্ত-অনুরাগীদের প্রতীক্ষার অবসার ঘটতে চলেছে আজ।  বর্তমান সময়ে বলিউডের সবচেয়ে আকাঙিক্ষত জুটি সাত

করোনা চিকিৎসায় প্লাজমা থেরাপি নয়

করোনা চিকিৎসায় প্লাজমা থেরাপি নয়

নিউজ ডেস্কঃ ২০১৯ সালে বিশ্বে হঠাৎ হানা দেয় নতুন ভাইরাস। ভালো করে কিছু বোঝার আগেই মহামারি থেকে অতিমারির আকার নেয়

প্রাকৃতিক দুর্যোগে মোবাইল সচল রাখতে

প্রাকৃতিক দুর্যোগে মোবাইল সচল রাখতে

নিউজ ডেস্কঃ দুর্যোগের সময় বিদ্যুতের গোলযোগ ঘটে এ সময় ফোনে চার্জ না থাকলে যোগাযোগ করা সম্ভব হয় না। ঝড়ের প্রভাবে ভেঙে

ফ্রান্সে খাশোগি হত্যা মামলার আসামি গ্রেফতার

ফ্রান্সে খাশোগি হত্যা মামলার আসামি গ্রেফতার

নিউজ ডেস্কঃ সৌদি আরবের রাজপরিবারের কঠোর সমালোচক যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত সাংবাদিক জামাল খাশোগির হত্যায় জড়িত সন্দেহে এক সৌদি নাগরিককে ফ্রান্সে গ্রেফতার করা

সিলেটসহ ৫ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বার্ন ইউনিট হচ্ছে

সিলেটসহ ৫ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বার্ন ইউনিট হচ্ছে

নিউজ ডেস্কঃ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) প্রায় ৭ হাজার ৪৪৭ কোটি ৭ লাখ টাকা ব্যয় সম্বলিত ১০টি প্রকল্প অনুমোদন

ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা ওমিক্রন থামাবে না: ডব্লিউএইচও

ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা ওমিক্রন থামাবে না: ডব্লিউএইচও

নিউজ ডেস্কঃ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাসের নতুন ধরন ওমিক্রন। এর বিস্তার রোধে বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হচ্ছে। তবে এই